নাচোল বিদ্রোহের অগ্নিকন্যা রাণী-মা

১৯৫০ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাঁওতাল অধ্যূষিত এলাকা নাচোলে যে রক্তক্ষয়ী কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাঁর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রামচন্দ্রপুরের জমিদার পুত্রবধূ বিপ্লবের অগ্নিকন্যা ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২)। এলাকায় তিনি পরিচিতা ছিলেন ‘বধূমাতা’ হিসেবে। ১৯৪৫ সালে রামচন্দ্রপুরের জমিদার পুত্র কমিউনিস্ট কর্মী রমেন মিত্রর সঙ্গে বিয়ে হয়। এবং এক সময় তিনি নিজে স্বামীর মত ও পথের সহযাত্রী হন। প্রথম রামচন্দ্রপুরে স্থাপন বালিকা বিদ্যালয়। তারপর আর থেমে নেই। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা প্রতিহত করতে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। সে বছর বাগেরহাটের মৌভোগে যে ঐতিহাসিক বঙ্গীয় কৃষাণ সভার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় চির অবহেলিত কৃষকদের তে-ভাগা আন্দোলনের। সে আন্দোলনের নেতৃত্বদান করেন ইলা মিত্র। তিনি হয়ে ওঠেন কৃষকদের আপনজন। তাঁকে অভিহিত করেন রাণী-মা বলে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ডামাডোলে কৃষক আন্দোলন সাময়িকভাবে কিছুটা স্তিমিত হলেও রাণী-মার একান্ত চেষ্টায় সে আন্দোলন অচিরেই দানা বাঁধতে শুরু করে। তারপর ১৯৫০ সালে ৫ জানুয়ারি জমিদারদের ভাড়াটে পুলিশ ও পুলিশদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ ঘটে। সেখানে পুলিশ বাহিনীর পিছু হটার দুদিন পর পাকিস্তান সরকার সেখানে দুই হাজার সেনা মোতায়েন করে। সেনারা ১২টি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। শতাধিক কৃষককর্মীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন সাঁওতাল অদিবাসী। গ্রামের প্রতিটি পরিবার টিকতে না পেরে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সেই সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সশরীরে ইলা-মা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনুধাবন করে সাঁওতালদের সঙ্গে তাঁদের পোষাক পরে পালাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাষাগত কারণে ডিবি পুলিশের হাতে শতাধিক সঙ্গীসহ ধরা পড়ে যান। তারপর তাঁর ওপর পুলিশের যে নির্মম নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নিপীড়ন চলে তা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। বিচারালয়ে তিনি কিছু না লুকিয়ে নারী হয়ে যে জবানবন্দী দিয়েছিলেন তা পড়ে বা শুনে আজও মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ইলা মিত্র সে এক অমর বিপ্লবীর প্রতিকৃতি।

১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর ইলা সেন (বিয়ের পর মিত্র) পিতার কর্মস্থল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের ঝিনাইদহ (সেকালের যশোহর) জেলার শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের এক বধিষ্ণু সেন পরিবারে। তাঁর বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন। বেঙ্গল ডেপুটি অ্যাকাউন্ট জেনারেল ছিলেন। ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা প্রিয় ইলা সেন। বিশেষ করে সাঁতারে পটু ছিলেন। ছোটবেলায় পৈতৃক গ্রামে বেশ কয়েকবার এসেছেন। সে গ্রামের মকছেদ আলী বিশ্বাস বয়সে ইলা সেনের চেয়ে কয়েক বছর বড় ছিলেন। কিন্তু খেলাধুলায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন। মকছেদ আলী বিশ্বাসের বরাত দিয়ে নাদিম মেহেদী (প্রথম আলোর ছুটির দিনে, পৃ. ৮) লিখেছেন, ‘...ছোটবেলায় যে কয়বার বেড়াতে এসেছেন, তাঁর সঙ্গেই খেলাধুলা করে বেড়াতেন। ইলা খুব খেলা প্রিয় ছিলেন। ইলা মিত্রের পরিবারের সঙ্গেও তাঁদের যথেষ্ট সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে ছুটে বেড়ালেও বাড়ির লোকজন খুব একটা রাগ করতেন না। কিন্তু পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিলে রাগারাগি করতেন। কিন্তু ইলা পানিতে লাফঝাঁপ করতে পছন্দ করতেন।’

কলকাতায় তাঁর লেখাপড়া শুরু। বেথুন স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪২ সালে আইএ এবং ১৯৪৪ সালে বাংলায় বিএ পাশ করেন। খেলাধুলায় সারা বাংলায় তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে সাঁতারে ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। অ্যাথলেটিক্স ছাড়াও বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টনে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। ত্রিশের দশকে তিনি ছিলেন বাংলার ক্রীড়াজগতের উজ্জ্বল তারকা। ১৯৪০ সালে ইলা সেন অলিম্পিকের জন্য ভারতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেবার দ্বাদশ অলিম্পিক (১৯৪০) অনুষ্ঠিত হয়নি। আশা করা হয়েছিল সেবার অলিম্পিক থেকে ভারত অন্তত: দু-একটি স্বর্ণপদক জিতে আনবে।

ইলা সেনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্রাবস্থায়। পাশাপাশি সমাজসেবা কাজেও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁরই নেতৃত্বে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice